২০২৬ রেজলিউশন
তিন্নি নববর্ষের সকালে বসে বসে বোর হচ্ছিল। ফোন করে বলল, কুন্তলা তোর রেজলিউশনের লিস্ট দে, পড়ে চোখ ঘোরাই আর তাহলেই হয়েছে বলে নাকের ভেতর দিয়ে হাসি।
তানানানা করছি দেখে বলল, না হয় ছোট দেখে লিস্টই দে।
খেলিয়ে লেখ দাবি করলে, না ভাই আমার আঙুলে মশা কামড়েছে বলে কাটানো যায়, কিন্তু যে অলরেডি অল্প করে চাইছে তাকে ফেরানো শক্ত। কাজেই এই থাকল আমার রেজলিউশনের ছোট দেখে লিস্ট।
১। দু’হাজার ছাব্বিশে আমি দরকারের বেশি একটি কথা দাঁতের ফাঁক দিয়ে বার করব না।
২। দু’হাজার ছাব্বিশে আমি অ্যালার্ম দিয়ে দিনে পনেরো মিনিট ইউটিউব শর্টস দেখব, ষোল মিনিট হয়ে গেলেই নিজের পিঠে কাঁটার চাবুক সপাং সপাং মারব।
৩। দু’হাজার ছাব্বিশে স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেব। যত না দু’হাজার ছাব্বিশ বলে তার থেকে বেশি পঁয়তাল্লিশ বলে। হাঁটাহুটি আমার ভালোই হয়, আমাকে কন্ট্রোল করতে হবে ডায়েট। আমি একটা অত্যাশ্চর্য পরিমাণ হাবিজাবি খাই। অর্চিষ্মান না থাকলে হিসেব নিয়ে দেখেছি, সারাদিন আমি তিন কাপ কফি, এক প্যাকেট ম্যাগি আর দুশো গ্রাম নাট ক্র্যাকার খেয়ে বসে থাকি। এ সব বন্ধ করব। পঁয়তাল্লিশে এইসব পেঁয়াজি করলে অচিরেই মূল্য চোকাতে হবে।
৪। দু’হাজার ছাব্বিশে কিছু লোকের নামে ভুডু পুতুল বানিয়ে রোজ খালি পেটে লাল চেলি পরে কপালে সিঁদুর লেপে কংকালের ওপর বসে সে সব পুতুলে মন্ত্রপূত পিন পুঁতব। আপাতত চারজনকে বেছেছি, মনে হচ্ছে একজন মিস হয়ে যাচ্ছে। নামটা পেটে আসছে মনে আসছে না। মনে আসার জন্য নিজেকে এক সপ্তাহ দিয়েছি, তারপর থেকেই তন্ত্রমন্ত্র চালু।
৫। লিখব, আই গেস।
ব্যস। এই হল দু’হাজার ছাব্বিশের আমার শর্ট অ্যান্ড সুইট রেজলিউশনের লিস্ট। তিন্নি, দেখ তোর কথা রাখলাম।
*
লিস্টের একটা রেজলিউশনও রাখা হবে না যদি না আগে অন্য কিছু হয়। কারণ ওপরেরগুলো সব বাইরের বদল। ভেতর না বদলালে বাহির বদলায় না। তিন্নি পড়তে বোর হয়ে যাবে জেনেও ভেতরের বদলগুলোর, বা ভেতরের বদলগুলো যে সব নীতির বেসিসে করব তাদের কথাই খেলিয়ে লিখছি।
১। প্রথমেই আমার ২০২৬-এর মিশন স্টেটমেন্ট। নেভার কমপ্লেন, নেভার এক্সপ্লেন।
আমার কথা নয়। একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে উদ্দীপ্ত করার উদ্দেশ্যে এ বাণী দিয়েছিলেন। বাণীটা অনেকদিন ধরেই জানি, যখনই মনে পড়ে (সাধারণতঃ কমপ্লেন করে ফেলার পর) হাই ফাইভ দিই। এ বছর আর হাই ফাইভ টাই ফাইভ নয়, কোমর বেঁধে মানব।
কমপ্লেনের মধ্যে কমিউনিকেশনও পড়বে। এই টক থেরাপির জমানায় যখন কমিউনিকেশন মানবচরিত্রের ‘ভার্চু অফ অল ভার্চুস’ গণ্য হচ্ছে, লোকে সিভিতে গুড টিম ওয়ার্কার-এর বদলে লিখছে ‘এক্সেলেন্ট কমিউনিকেটর’, প্রোফাইলে কমিউনিকেশন বা কমিউনিকেশনের রকমফের না থাকলে বাম্বল হিঞ্জ শাদি ডট কম সাবস্ক্রিপশন বাতিল করছে, আমি, কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়, বুক ফুলিয়ে গোড়ালি ঠুকে নিজের অবস্থান ঘোষণা করছি ।
দু’হাজার ছাব্বিশে আমার কমপ্লেন হবে জিরো, কমিউনিকেশন মিনিমাম। মারো ধরো পাগলা কুকুর লেলিয়ে দাও, ডোন্ট কেয়ার। চিরকালই নন-কমিউনিকেশন পছন্দ ছিল, দু’হাজার ছাব্বিশে পছন্দটাকে আইডেন্টিটিতে বদলে ফেলব। কারণ কেউ শিশু না। আমি যদি আমার অসুবিধেজনক রকমসকম সম্পর্কে সচেতন হই, সবাই সচেতন। কারণ সবাই অ্যাট লিস্ট আমার মতো বুদ্ধিমান। সবাই জানে কী করেছে, কেন করেছে। কেন এ রকম করলে, আমার খুব কষ্ট হল, এ রকম করা তোমার উচিত হয়নি - এ সব বলে নিজের ভোকাল কর্ডের চলটা ওঠানো ছাগলামো।
নিজের যা করারও করেই ফেলব। ব্যাখ্যাট্যাখ্যা দেব না। অন্যের মতামতের কেয়ার করি না বলে নয়, আমি কী করলাম সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না বলে। সবাই যে যার জীবনের ঘোল খেতে ব্যস্ত, আমি কী করছি না করছি নোবডি কেয়ারস।
২। নোবডি কেয়ারস - সন্দেহটাকে বিশ্বাসে বদলে ফেলব। এবং ছুটি ছুটি বলে হাতে হাওয়াই চটি গলিয়ে জীবনের পথে ছুটে যাব। ওঃ, অলরেডি রোমাঞ্চ হচ্ছে। ভাবুন, জীবনে প্রত্যাশাপূরণের দায় নেই, কারণ কারও কোনও প্রত্যাশাই নেই আমার থেকে। হ্যাপি বার্থডে-র উত্তরে ইউ টু বলে মাঝরাতে শিউরে ঘুম ভাঙা নেই, কারণ নোবডি কেয়ারস। এর সঙ্গে ব্যবহার বেশি মিষ্টি হয়ে গেল নাকি ওর সঙ্গে বাড়াবাড়ি তেতো - টেনশনে বাকি পাঁচ পারসেন্ট কালো চুল সাদা করা নেই। কারণ?
কারণ নোবডি কেয়ারস।
কাল দুপুরে রিষড়ার টেবিলে বসে রুটি আলুভাজা খাচ্ছিলাম, লাঞ্চের পক্ষে যা বাড়াবাড়ি রকম তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে মনে করে আমার এক ঘনিষ্ঠ নিজের পাত থেকে চিকেনের একপিস আমাকে দেওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করছিলেন।
বললাম, আমি তো খাই না।
তিনি জেনুইন অবাক হলেন। সে কী কেন, কবে থেকে, তাহলে প্রোটিন পাচ্ছ কোত্থেকে, তাই তো বলি সোনার চেহারার এই ছিরি হয়েছে কেন।
ইনি আমাকে দু’হাজার ষোলটোল থেকে চেনেন, দু’হাজার সতেরোয় নিরামিষ ধরার সময় উপস্থিত ছিলেন, প্রোটিন এবং আমার চেহারা নিয়ে সিমিলার দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন, দু’হাজার উনিশের চোদ্দই জুলাইয়ের পর থেকে যখনই বাড়ি গেছি আমাকে দু’বেলা নিজে হাতে খেতে দিয়েছেন।
এবং এঁর ডেফিনিটলি স্মৃতিভ্রংশ হয়নি।
আমি এঁর ব্রেনে এত কম জায়গা অধিকার করি যে আমার খাদ্যাভ্যাস উনি স্টোরই করেননি। ঠিকই করেছেন। করা উচিতও না। আমিও কাউকে আমার ব্রেনে জায়গা দিই না, দেব কোত্থেকে, নিজেকে নিয়ে ভাবতেই সব জায়গা খরচ হয়ে যায়।
ঘটনাটা নতুন করে মনে করাল যে আমরা অন্য মানুষের ঠিক কত পরিমাণ মনোযোগ অধিকার করে রাখি। নিউজফ্ল্যাশ - বেশি নয়। কাজেই দু’হাজার ছাব্বিশে আমি জানব যে নোবডি কেয়ারস এবং সেইভাবেই জীবনের মধ্য দিয়ে চলব।
৩। দু’হাজার ছাব্বিশে আই উইল টেক ইট ইজি। যা সহজে হয় সেগুলোই হবে, বাকি কিছু হবেটবে না। আমি সাধব না, কাঁদব না, প্রাণপাত করব না। অন্য লোকের জন্য বলছি না শুধু, নিজের জীবনের প্রতিও একই উদাসীনতা পোষণ করব। অত হাঁকপাঁকের কিছু হয়নি। হলে হবে, না হলে হবে না। আই অ্যাম গুড ইদার ওয়ে।
৪। কমপ্লেন যদি করেও ফেলি, এক্সপ্লেন থেকে বিরত থাকার সংযম যদি নাও দেখাই, এই চতুর্থ এবং শেষ রেজলিউশনটা মানছি। ডাইনে যাই বা বাঁয়ে যাই, আই অ্যাম গুড ইদার ওয়ে। লোকে কেয়ার করুক না করুক, আই অ্যাম গুড ইদার ওয়ে। যা চাই তা পাই না পাই, আই অ্যাম গুড ইদার ওয়ে।
*
একটা ঘটনা না ঘটলে এই একস্ট্রা রেজলিউশনটা নেওয়ার দরকার পড়ত না কারণ রেজলিউশনটা অলরেডি নেওয়া আছে। দু’হাজার পঁচিশেও ছিল, চব্বিশেও, তেইশেও, সেই অর্কুট না মরকুট কবে থেকে চালু হয়েছিল আর সবার সব ঝোলাঝুলির উত্তরে আর আমি ন্যাড়ার মতো বলে চলেছিলাম, না ভাই আমাকে তোমরা অ্যাকাউন্ট খুলতে বোল না - রেজলিউশনটা সেই আমলের।
রেজলিউশন আর বলা যায় না এটাকে। তবু,রেজলিউশনের পোস্টেই কথা হচ্ছে যখন সেই ক্যাটেগরিতেই ফেলি। আমার রেজলিউশন - দু’হাজার পঁচিশ, চব্বিশ, তেইশের মতোই দু’হাজার ছাব্বিশেও সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগ না দেওয়া।
এইখানে ডিসক্লেমার দিতে হবে। আমি একসময় ফেসবুকে বেনামে ঘুরতাম। দলছেঁড়া কচুরিপানার মতো। জিরো অ্যাকটিভিটি। কারও পোস্টে কমেন্ট করিনি কোনওদিন, কোনও বন্ধুও ছিল না যে আমার পোস্টে কমেন্ট করবে। পোস্ট থাকলে তো করবে। রোম পুড়তে দেখার নিরোসম নারকীয় উদাসীনতায় আমি ফেসবুকে ঘুরে বেড়াতাম আর লোকজনকে নিরীক্ষণ করতাম।
নিরোর মতোই নারকীয় উল্লাসে বুক ফুলে উঠত। আমি যত ওঁচাই হই না কেন, এদের থেকে বেটার।
কিন্তু রসাতলের একটা ব্যাপার আছে, কিছু কিছু লম্বা রোগা ছেলেদের যা থাকে। নিজের মনে ফোন দেখছে ভ্রমে সাহস করে আড়চোখে বারকয়েক তাকিয়ে ফেললেই রক্ষা নেই, রসাতল একসময় চোখ তুলে মুচকি হাসবে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হল। ফেসবুক-ফেমাস একটি আত্মহত্যার বাজারে আমি আর সে হাসি নিতে পারলাম না, ফেক অ্যাকাউন্ট ত্যাগ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। দু’হাজার কুড়ি নাগাদ ভিন্ন শহরে বাড়ি খোঁজার ব্যবহারিক প্রয়োজনে স্বনামে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়েছিল। অবভিয়াসলি, কাউকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টমিকোয়েস্ট পাঠাইনি। কিন্তু অ্যাকাউন্ট খোলার পাঁচ মিনিটের মধ্যে শ্বশুরবাড়ির তিন অতি প্রিয় গুরুজন আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বসলেন। ঘেমেনেয়ে উঠলেও একটিরও উত্তর দিলাম না এবং তাঁদের ঝুলিয়ে রেখে কাজ মিটিয়ে সে অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম।
তিনবছরের ওপর হল ফেসবুকের সঙ্গে নামেবেনামে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। অন্ততঃ, পরশু হোয়াটসঅ্যাপে একটা লিংক এসে হাজির হওয়ার আগে পর্যন্ত ছিল না।
লিংক অনেকেই পাঠায় কিন্তু এই লিংকটা একটু বিশেষ ধরণের কারণ লিংকটার সঙ্গে আমার একটা লিংক আছে। ক্লিক করলাম। ফেসবুকের স্মৃতির জবাব নেই, ফটাস করে পুরোনো লগইনের অপশনের লোভ দেখাল। কুচ করে সে লোভের গোড়া কেটে এমনি যতটা দেখা যায় ততটাতেই তুষ্ট থাকলাম।
অরিজিন্যাল পোস্ট দেখা যায়। পোস্টে ক’জন লাইক দিয়েছেন দেখা যায়। কে কে দিয়েছেন দেখা যায় না। মোস্ট রেলেভ্যান্ট কমেন্ট কয়েকটা পড়া যায়।
রসাতলের হাসি ওইটুকুই যথেষ্ট।
আমার চেনা একজনের প্রায় সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই অ্যাকাউন্ট আছে, স্বনামেই। বাস্তব জীবনের মতো ভার্চুয়াল জীবনেও তিনি চুপ করেই থাকেন। একবার ইন্সটাগ্রাম না টুইটারে কোথায় একটা ছবি ছেপেছিলেন বা দু’লাইন লিখেছিলেন। তারপর তিনি আমাকে বলেছিলেন, কুন্তলা, সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা যে কী সাঙ্ঘাতিক, পোস্টটা করার পর আমি যে কতবার ঢুকে চেক করছিলাম কে কে পড়ল, কে কে লাইক দিল, কে কে ভালো বলল। আমার মগজের একটা পার্ট বেসিক্যালি ওইখানেই আটকে গেল, বাকি মগজটা সারাদিন হাফহার্টেডলি অফিসে বসে ছিল।
আমিও আটকে গেলাম। লগ ইন করিনি বলে লাইকদাতাদের পরিচয় জানতে পারছি না কিন্তু লাইক বাড়ছে না কমছে সেটা তো দেখতে পাচ্ছি। দু’ঘণ্টা পরপর লিংকে ক্লিক করে গুনতে থাকলাম। লাইক যথারীতি আমার পছন্দের থেকে হাস্যকর রকমের কম স্পিডে বাড়ল। কমেন্ট তো সেই যে আটকাল এগোয়ই না। আমি হেউ বলে কাল্পনিক মাঠের কাল্পনিক ঘাস ছিঁড়ে চিবোতে থাকলাম।
অবশেষে, একটা নতুন কমেন্ট। ভিজিবল। উত্তেজনায় বিষম খেতে খেতে স্ক্রোল করে নিচে নামলাম। পড়লাম। থমকালাম।
দেখুন, ভদ্রলোকের কমেন্ট আমার উদ্দেশ্যে নয় সে আমি জানি। ইন্টারনেটে র্যান্ডম লোকের গালি খাওয়ার মতো ইম্পরট্যান্ট আমি নই। উনি বেসিক্যালি পোস্টদাতার ওপর গায়ের ঝাল ঝাড়তে এসেছেন, আমি প্যাকেজে পড়ে গেছি।
ভদ্রলোক দাবি করেছেন এই প্রজাতিটা (আমিও সেই প্রজাতির, আই গেস) বেসিক্যালি আরবান নকশাল। এদের জন্যই ষাটের দশকের পর থেকে বাঙালির আর কিছু হল না। উত্তমকুমারের পর নায়ক হল না, হেমন্তর পর গায়ক হোল না, বিধান রায়ের পর মুখ্যমন্ত্রী হল না। উদাহরণগুলো উনি লেখেননি, ওঁর মনের ভাব প্রাঞ্জল করার জন্য আমি লিখছি।
উল্টে বাঙালি গোটা ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের হাসির পাত্র হয়ে গেল। এটা উনি লিখেছেন।
লিখবেন বইকি। ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে নিজের মনের ভাব লিখে পড়ে নেচে গেয়ে কবিতা বলে ভিডিও তুলে প্রকাশ করাই উচিত। আমি যেমন করি। ভদ্রলোকের কমেন্ট পড়ে আমার অ্যাকচুয়ালি অল্প অল্প পাপবোধই হচ্ছিল। সরি বলে সরে আসব ভেবে সবে নুয়ে পড়ে হাত জোড় করছি এমন সময় তাঁর কমেন্টের লাস্ট বাক্য পড়লাম।
এই প্রজাতি ধ্বংস হোক।
ভদ্রলোকের সঙ্গে বাবার আনক্যানি মিল। লগ ইন করিনি কাজেই পুঁচকে প্রোফাইল পিকেই যা দেখার দেখছি, কিন্তু চুলের সাদা, মুখের লাইনটাইন বাবার মতোই। বাপের বয়সী একজন র্যান্ডম লোকের অভিশাপ নিয়ে দু’হাজার ছাব্বিশে প্রবেশ করছি।
র্যান্ডম লোকের ভ্যালিডেশনের লোভ ত্যাগ দিতে পারিনি বলে।
কেউ কেউ বলবে, এরা তো থাকবেই। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কত লোকে ট্যাক্সির জানালা, বাসের জানালা, অটোর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে শাপশাপান্ত করে, তা বলে কি কেউ রাস্তায় হাঁটা ছেড়ে দেয়? গায়ের চামড়া এত পাতলা হলে জীবনের পথে হাঁটা যায় না।
দুটো কথা আছে। হাঁটা নিশ্চয় ছেড়ে দেব না, কিন্তু তা বলে এমন রাস্তা দিয়েও হাঁটব না যেখানে নিয়ম করে সব বাস অটো ট্যাক্সির সব জানালা থেকে কোটি কোটি লোক মুখ বার করে আমার ধ্বংস কামনা করছে। তাছাড়া আমি তো বিধবাবিবাহ চালু করতে, বা সতীদাহ রদ করতে, বা মহিলাদের ভোটাধিকার চাইতে হাঁটছি না। ওসব করতে যারা হেঁটেছেন, এখনও হাঁটছেন, পরেও হাঁটবেন তাঁরা শাপশাপান্ত কেন, উড়ে আসা থুতু ঢিল গুলির মধ্য দিয়েই হেঁটেছেন হাঁটছেন হাঁটবেন। হাঁটতেই হয়। অন্য রাস্তা নেই।
হাবিজাবি লিখে হাততালি কুড়োনোর জন্য এ রাস্তায় হাঁটা নট ওয়ার্থ ইট।
তবে আরও জরুরি যে কারণে আমার ওই রাস্তা যে কোনও মূল্যে এড়ানো উচিত সেটা হচ্ছে, আমি মহামানব তো নইই, আমার রকমসকম বরং জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে যারা চেঁচাচ্ছে তাদের বিপজ্জনক কাছাকাছি। সঙ্গে পড়ে নিজে কোনদিন চেঁচাতে শুরু করব।
আত্মার অনেক অবমাননা করেছি পঁয়তাল্লিশ বছরে, এটা করব না।
আর চামড়ার পুরুত্ব? ওপরের লিস্টে লিখিনি বুঝি? দু'হাজার ছাব্বিশে আমার সৌন্দর্যসংক্রান্ত একমাত্র শপথ হচ্ছে ঘষেমেজে গায়ের (বাই ডিফল্ট মুখেরও) চামড়া যথাসম্ভব পাতলা রাখা।
*
শুনুন, এই পোস্টটা তিন্নির সঙ্গে রসিকতার উত্তরে লেখা। অধিকাংশটাই খেলা, তবে আনাচেকানাচে চোখ বোজা ঠোঁট নাড়া মনস্কামনাও আছে। কোথায় কোথায় আছে বলব না।
যা রেজলিউশনই নিই না কেন, তার যত পারসেন্টই পূর্ণ করতে পারি না কেন, আমি জানি দু’হাজার ছাব্বিশ পঁচিশের মতোই কাটবে। কারণ দু'হাজার পঁচিশও আমি আমি ছিলাম, আমার জীবন একটা মানুষের জীবন ছিল, ছাব্বিশও আমি আমিই আর আমার জীবন মানুষের জীবনই থাকবে। জীবন এই রকমই কাটে। দুঃখ। হৃদয়ভঙ্গ। নিজেকে দেওয়া কথা না রাখতে পারা। পঁচিশে ডিসেম্বর পার হলেই মনে হওয়া, হেউ, এ বছরও হল না। একত্রিশে রাতে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে ভাবা, দু'হাজার সাতাশের জন্য ক'টা রেজলিউশন নিলে কেমন হয়?
বছর জুড়ে আনন্দকণাও থাকবে। পঁচিশে যেমন ছিল।
সে রকম একটা আনন্দকণার খবর দিয়ে পোস্ট শেষ করব। কণাটা কুড়িয়ে পেয়েছি, অ্যাকচুয়ালি ঘাড়ে এসে পড়েছে বলাই উচিত, যা আমার আনন্দ কয়েকশো কোটিগুণ বর্ধিত করেছে, এই আগের সপ্তাহেই। সাতাশে বাড়ি গেলাম, তার দিনদুয়েক আগে।
ব্লু টোকাইতে একটা মেয়ে আসে। কলেজের হোমওয়ার্ক করে বসে বসে। আরও অনেক ছেলেমেয়ের মতোই। তফাৎ হচ্ছে এর চুলের ডগা নীল, দুই নাকের ফুটোর মাঝের তরুণাস্থি থেকে দুলন্ত নথ, পাখির মতো পাতলা ঠ্যাঙের অন্তে কুড়ি কেজি বাটখারাপ্রতিম বুটজুতো, বাঁশের মতো বডিতে ওভারসাইজড বম্বার জ্যাকেট এবং বডি ল্যাংগোয়েজে অগাধ গাম্ভীর্য। অগাধ অসীম অপরিসীম।
এক কথায়, কুল গার্ল। ছোটবেলায় যাদের আশেপাশে দেখিইনি, দেখলে প্যালপিটেশনে নির্ঘাত নেক্সট স্টেশনে ট্রেনের কামরা বদল করতে হত। এখন এর শিশুত্বের আন্দাজ আছে, তাই গাম্ভীর্য দেখে মনে মনে হেসেছি। হাসি মুখে আনার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ বুকের মধ্যে মফঃস্বলের বাংলা মিডিয়াম এখনও গ্যাঁট হয়ে আছে, আমৃত্যু থাকবে।
আমি হাসলেও কিছু যাবে আসবে না। আমি যে পৃথিবীর মাটিতে হেঁটেচলে বেড়াই সেটাই এ মেয়ে জানে না। পঁচিশের নিচের কেউই জানে না। আমার পঁয়তাল্লিশ ওদের পৃথিবীতে একটা ধোঁয়া ধোঁয়া কল্পনামাত্র।
পঁচিশে ডিসেম্বরের আগেপিছে, বিকেল চারটে নাগাদ ব্লু টোকাইয়ের সামনের চাতালের চিলতে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ব্রেক নিচ্ছিলাম, এমন সময় ঘাড়ের কাছে নীল চুল, চাংকি বুটসের আভাস।
চোখাচোখি হল। আমি থতমত খেলাম। গম্ভীর মেয়ে গম্ভীর গলায় বলল, দিস উইল সাউন্ড উইয়ার্ড বাট আই অ্যাম স্টিল গোয়িং টু সে ইট। ইউ আর কুল। আই ওয়ান্ট টু বি লাইক ইউ হোয়েন আই গ্রো আপ।
শ্বাসনালীতে ধোঁয়া আটকে যে কাশির দমকটা আসছিল তাকে বললাম এখন আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করলেও রক্তারক্তি হয়ে যাবে। আক্ষরিক ঘাড় ঘুরিয়ে এপাশ ওপাশ আগুপিছু পরীক্ষা করলাম। মেয়েটা কাকে বলছে এ সব?
আমাকেই বলছে।
মেয়েটার নাম নীল। অফ কোর্স। এ সব মেয়ের নাম নীল হবে না তো কি নীলাম্বরী হবে? যদি হয়েও থাকে, বাবামা যদি নীলাম্বরী, নীলাঞ্জনা, নীলনয়না রেখেও থাকেন এ ছোট করে নিয়েছে।
বললাম, শোন নীল, আগের সপ্তাহে আমার পঁয়তাল্লিশ হয়েছে, এই পঁয়তাল্লিশ বছরে এই বিশেষ অ্যাডজেক্টিভটা আমার জন্য কেউ ব্যবহার করেনি।
নীল সেটা অলরেডি আন্দাজ করেছে। তা সত্ত্বেও ওর আমাকে কেন কুল লাগছে নিজেই বলল। কারণ আমি একা একা ব্রেক নিই আর লাঞ্চে একা একা পার্কে দু’পাক হেঁটে আসি।
আই ওয়ান্ট টু রোম অ্যারাউন্ড অ্যালোন। লাইক ইউ।
মিনিটদুয়েক কথা হল। আমার রসিকতার প্যাথেটিক প্রচেষ্টায় নীল হাসল। এই প্রথম নীলের হাসি দেখলাম। হাসলে বয়স একেবারে পর্দাফাঁস। তারপর টাটা করে নীল বারান্দার কোণে নিজের টেবিলে চলে গেল, আমি ভেতরে ঢুকে নিজের টেবিলে বসলাম। দেখতে বসার মতো লাগল, আসলে তো শরীরের প্রতিটি কোষ গোলাপি গ্যাসবেলুনের মতো ব্লু টোকাইয়ে সিলিং-এ সেঁটে গেছে। অর্চিষ্মানকে লিখলাম, থাকলে পিং কোরো। এমারজেন্সি।
এখন বিপিটিপি নর্ম্যাল রেঞ্জে নেমে এসেছে, ঘটনার পরের আটচল্লিশ ঘণ্টা অবর্ণনীয় কেটেছে। স্থির হয়ে বসতে পারছি না, ঘন ঘন জল খেতে হচ্ছে, অর্চিষ্মানকে দেড় মিনিট অন্তর খুঁচিয়ে জানতে চাইছি যে ব্যাপারটার গুরুত্ব ও অনুধাবন করতে পারছে কি না। নীল চুলের নীল নামের একটা কলেজ কিড আমাকে কুল বলেছে!
অর্চিষ্মান বলল, সেটা নিয়ে তুমি যে পরিমাণ আনকুলপনা করছ, কুন্তলা, কলেজ কিড দেখলে শিউরে উঠে পালাত।
*
জয় বাবা দু’হাজার ছাব্বিশ, জয় বাবা নাকি জয় মা আই ডোন্ট কেয়ার ইদার ওয়ে, আর কিছু দাও না দাও, কুলনেস দিয়ো। সামনের বছর যদি শুধু একটু কুল হতে পারি, কমপ্লেনএক্সপ্লেনের ধার করা ফিরিঙ্গি নীতি গঙ্গায় ভাসিয়ে দেব, সারাদিন মুখে ফেনা তুলে অবান্তর বকে যাব, কারও নামে পুতুল বানিয়ে পিন গোঁজার কল্পনাও যে করেছিলাম তার প্রায়শ্চিত্তে নিজেই নিজের পিঠে সপাং সপাং কাঁটার চাবুক মারব। অন গড ফাদার মাদার।
আপনাদের সবাইকে আমার দু’হাজার ছাব্বিশের অসংখ্য অগুন্তি শুভেচ্ছা ভালোবাসা আরও যা যা ভালো দিয়ে শব্দ আছে বঙ্গীয় শব্দকোষে - সব থাকল। হ্যাপি নিউ ইয়াআআআআর!
Comments
Post a Comment